এক চিলতে রোদ এবং এক কাপ কফি
শহরের ব্যস্ততা যখন জানালার গ্রিল গলে ঘরের কোণে এসে পড়ে, তখন এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর এক টুকরো নীরবতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমরা প্রতিদিন কত মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাই, কত চেনা মুখ অচেনা হয়ে যায়। কিন্তু দিনশেষে...
১৯৯০ সালের আগস্টে ইরাক,কুয়েত আক্রমণ করে।স্কুলে পড়ি।বাংলাদেশেও এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলে। ভাইয়া আমার চেয়ে একটু বড়।ভাইয়ারা এরশাদের বিরুদ্ধে কি কি বলে আর যেখানে সেখানে গাড়ির পুরোনো টায়ারে আগুন দেয়।মীরপুরের ১২ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১ নম্বর লাইনের যে বাসায় থাকি আমরা সে বাসার টিন ফিন পুরানো হয়ে এমন অবস্থা যে তা মোটামুটি বাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। আম্মু বাংলাদেশ ব্যাংকে জব করে,আম্মুর হাউজ বিল্ডিং লোন পাশ হলো। আমরা জন্মের পরে প্রথম একটা ভাড়া বাসায় উঠলাম কারণ আমাদের নিজেদের বাড়িটা ভেঙে করতে হবে। আমরা কাছেই আমার ক্লাসমেট প্রতীকদের বাসার নীচ তলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠলাম।
আমরা উঠার কয়দিন পরেই দোতলায় ভাড়াটিয়া এলো,আমরা নীচতলায় তারা দোতলায়।খিজির সাহেব।সে না কি কুয়েত থেকে গাড়ি চালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।গাড়িটাও দেখি। এদিকে স্কুলের খাতা কিনতাম আগে ম্যাকগাইভারের মলাটওয়ালা।তারপর শুরু হলো চারিদিকে সাদ্দামের ছবি দেয়া খাতা কেনা।নিউজ পেপার খুললেই বড়রা বলে 'বাপের ব্যাটা সাদ্দাম'।
১৯৯১ সালের শুরুর দিকে ইরাকে,অনেকগুলো দেশ একসাথে হয়ে আক্রমণ করলো আমেরিকার নেতৃত্বে। বাংলাদেশে ততোদিনে স্বৈরাচার এরশাদের পতন হয়েছে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো না। দুই সাবজেক্ট বাকী থাকতে স্কুল বন্ধ হয়ে গেল।ডাক্তার মিলন নামে একজন মা/রা গিয়েছে সেজন্য।
আমেরিকা ইরাক আক্রমণের আগে শুনলাম ইরাকী সৈন্যরা না কি কুয়েতের হাসপাতালে আক্রমণ করেছে।সেখানে ইনকিউবেটরে রাখা নবজাতক বাচ্চাদের না কি ঠান্ডা মেঝেতে ফেলে মে/রে ফেলেছে।ইরাকী সৈন্যদের করা এই নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছে কুয়েতের আদান হাসপাতালে কাজ করা এক ১৫ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক নার্স। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে আমরাও কাঁদলাম। আর ভাবলাম মানুষ এত নিষ্ঠুর!
বহু বহু বছর পরে ২০০৬ সালে বাপের ব্যাটা সাদ্দামের যখন মৃ/ত্যু হলো তখন জানলাম এই ১৫ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক নার্স না কি আমেরিকায় থাকা কুয়েত দূতাবাসের এম্বাসেডরের কন্যা। সে কোনদিন কোন নার্সগিরি করেনি। আমেরিকার জনগণ ইরাকে যুদ্ধ শুরু করে নিজেদের সন্তানদের সেখানে সৈন্য হিসেবে পাঠিয়ে মৃ/ত্যুর দিকে ঠেলে দিতে চাচ্ছিলো না। জনগণের সমর্থন আদায় করার জন্য আমেরিকা কুয়েত থেকে টাকা এনে পিআর কোম্পানি দিয়ে এই হৃদয়বিদারক(!) নির্যাতনের ভুয়া প্লট তৈরী করে নায়ারকে সামনে রেখে। সব মিডিয়া ছেয়ে যায় নায়ারের কান্নাবিজড়িত সেই সাক্ষ্যে।
আমেরিকার জনগণ কুয়েতকে বাঁচাতে ইরাকে সৈন্য পাঠাতে রাজি হয়।
তারপরের কাহিনী তো এই অনলাইনের যুগে সবার জানা-ইরাক একের পর এক স্যাংশনে একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়,সাথে চলে মার্কিন সৈন্যবাহিনীর আগ্রাসন।সুপ্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ জাস্ট একটা প্রোপাগান্ডা দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা শেষ করে দেয়। ইরাক এখন নামেই একটা দেশ। কিছুই আর তাদের নিজের বলে অবশিষ্ট নেই।
হিল অ্যান্ড নোলেটন (Hill & Knowlton) নামক পিআর কোম্পানি একটি দেশের কোটি মানুষকে হ/ত্যাযোগ্য করে তোলে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত কুয়েতের রাষ্ট্রদূত সউদ আল-সাবাহ-এর কন্যা নায়ারের মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প দিয়ে।
পিআর কোম্পানি জানতো যুক্তি কখনো যুদ্ধ শুরু করায় না।আবেগ যুদ্ধ শুরু করায়।আমেরিকা যখনই কোথাও কোন অপারেশন শুরু করে তারা সত্য জানায় না,তারা পিআর কোম্পানি দিয়ে সাজানো গল্প শোনায়। আমাদের আবেগের ঘরে হিউম্যান স্টোরি দিয়ে ক্ষোভ রাগ তৈরী করে।আমরা কোন কিছু বিবেচনা না করে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি।ইরাকের মতো আমাদের সব শেষ হয়ে যায়,তেলক্ষেত্র চলে যায় মার্কিনিদের হাতে। এবং ১০/১৫ বছর পরে দেখি আমরা নিজেদের ভূ-খন্ডে বাস করছি ভিন্ন একটি দেশকে তোলা দিয়ে।
তাই মিডিয়ার বলা গল্পগুলো বিশ্বাস করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনার আগে,চোখের পানি ফেলার আগে নায়ারদের গল্প রচয়িতাকে চেনা অনেক বেশি প্রয়োজন।কে না জানে শয়তান ছিল সবচেয়ে বড় ফেরেশতা!
শহরের ব্যস্ততা যখন জানালার গ্রিল গলে ঘরের কোণে এসে পড়ে, তখন এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর এক টুকরো নীরবতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমরা প্রতিদিন কত মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাই, কত চেনা মুখ অচেনা হয়ে যায়। কিন্তু দিনশেষে...